কালোজিরা যেসব রোগের মহৌষধ

Blog Cover Photo

🌱 কালোজিরাঃ

ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কালিজিরাকে একটি অব্যর্থ রোগ নিরাময়ের উপকরণ হিসেবে বিশ্বাস করে। হাদিসে আছে কালিজিরা মৃত্যু ব্যতীত অন্য সব রোগ নিরাময় করে। এজন্য কালিজিরাকে সব রোগের ওষুধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

কালিজিরার ইংরেজি নাম Fennel flower, Nutmeg flower, Roman Coriander, Black seed or Black caraway| অন্যান্য বাংলা নাম কালিজিরা, কালোজিরা, কালো কেওড়া, রোমান ধনে, নিজেলা, কালঞ্জি এসব। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই কালো বীজের গুণাগুণ স্বাস্থ্য উপকারিতা অপরিসীম অসাধারণ কালজয়ী।

কালিজিরার যে অংশটি ব্যবহার করা হয় তাহলো শুকনো বীজ ও বীজ থেকে পাওয়া তেল। কালিজিরা খাদ্যাভাসের ফলে আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কালিজিরা আয়ুর্বেদীয়, ইউনানি, কবিরাজি ও লোকজ চিকিৎসায় বহু রকমের ব্যবহার আছে। এছাড়া প্রসাধনীতেও কালিজিরা ব্যবহার হয়। মসলা হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার আছে বিশ্বব্যাপী। পাঁচ ফোড়নের একটি অন্যতম উপাদান। কালিজিরা ফুলের মধু উৎকৃষ্ট মধু হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিবেচিত, কালোজিরার তেল আমাদের শরীরের জন্য অনেক উপকারী।

নিয়মিত ও পরিমিত কালিজিরা সেবনে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সতেজ করে ও সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি সমৃদ্ধি সাধন করে। এক কথায় আশ্চর্য বীজ কালিজিরার উপকারিতা বহুমুখী।


🌱 কালিজিরার পুষ্টিগুণঃ

কালিজিরাতে প্রায় শতাধিক পুষ্টি ও উপকারী উপাদান আছে। এতে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধক ক্যারোটিন ও শক্তিশালী হরমোন, প্রস্রাবের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকারী উপাদান, পাচক এনজাইম ও অম্লনাশক উপাদান এবং অম্লরোগের প্রতিষেধক। এছাড়া রয়েছে নাইজেলোন, থাইমোকিনোন ও স্থায়ী তেল।

পাশাপাশি কালিজিরার তেলে আছে লিনোলিক এসিড, অলিক এসিড, ফসফেট, লৌহ, ফসফরাস, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, জিংক, ম্যাগনেশিয়াম, সেলেনিয়াম, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-বি২, নিয়াসিন ও ভিটামিন-সি ছাড়াও জীবাণুনাশক বিভিন্ন উপাদান।

কালিজিরার প্রধান উপাদানের মধ্যে রয়েছে  আমিষ ২১, শতাংশ, শর্করা ৩৮ শতাংশ, স্নেহ বা ভেষজ তেল ও চর্বি ৩৫ শতাংশ। এছাড়াও ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ আছে।

প্রতি গ্রাম কালিজিরার পুষ্টি উপাদান হলোঃ-

১। প্রোটিন ২০৮ মাইক্রোগ্রাম

২। ভিটামিন বি১ ১৫ মাইক্রোগ্রাম

৩। নিয়াসিন ৫৭ মাইক্রোগ্রাম

৪। ক্যালসিয়াম ১.৮৫ মাইক্রোগ্রাম

৫। আয়রন ১০৫ মাইক্রোগ্রাম

৬। ফসফরাস ৫.২৬ মিলিগ্রাম

৭। কপার ১৮ মাইক্রোগ্রাম

৮। জিংক ৬০ মাইক্রোগ্রাম

৯। ফোলাসিন ৬১০ আইউ

🌱 কালিজিরা সেবনের উপকারিতাঃ

👉 নিদ্রাহিনতা দূরীকরণঃ কালোজিরা তেল ব্যবহারে রাতভর প্রশান্তিপর্ন নিদ্রা হয়। সপ্তাহে মাথার মাঝখানে, কপালে উভয় চিবুকে ও কানেরপার্শ্ববর্তি স্থানে দৈনিক কালোজিরার তেল মালিশ করূন। সচরাচর মাথাব্যথায় মালিশের জন্য রসুনের তেল, তিলের তেল ও কালোজিরার তেলের সংমিশ্রণ মাথায় ব্যবহার করুন।

👉 ঠাণ্ডা বা শ্বাস কষ্ট বা হাঁপানি রোগ নিরাময়ঃ সর্দি-কাশিতে আরাম পেতে, এক চা চামচ কালোজিরার তেলের সঙ্গে ১ চা চামচ মধু বা এক কাপ লাল চায়ের সঙ্গে আধ চা চামচ কালোজিরের তেল মিশিয়ে দিনে তিনবার খান। অথবা এক চা-চামচ কালোজিরার সঙ্গে তিন চা-চামচ মধু ও দুই চা-চামচ তুলসি পাতার রস মিশিয়ে খেলেও সর্দি-কাশি কমে।

একটি পরিষ্কার কাপড়ে কালোজিরা জড়িয়ে তা নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে বড় করে শ্বাস টানুন কিছুক্ষণ ধরে। এর ঝাঁজ বুকে জমে থাকা শ্লেষ্মাকে টেনে বার করতে সাহায্য করে। নাক বন্ধের সমস্যাতেও ঘরোয়া এই উপায়ের জুড়ি মেলা ভার।

যারা হাঁপানী বা শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যায় প্রতিদিন কালোজিরার ভর্তা রাখুন খাদ্য তালিকায়। এছাড়া এক কাপ চা-চামচ কালোজিরার তেল, এক কাপ দুধ বা রং চায়ের সাথে দৈনিক ৩বার করে নিয়মিত সেবন করুন।

👉 যৌন দুর্বলতা বা অক্ষমতা নিরাময়ঃ কালোজিরা চুর্ণ ও অলিভ অয়েল, ৫০ গ্রাম হেলেঞ্চার রস ও ২০০ গ্রাম খাঁটি মধু একসঙ্গে মিশিয়ে সকালে খাবারের পর এক চামচ করে খান। এতে গোপন শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

👉 উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণঃ যখনই গরম পানীয় বা চা পান করবেন, তখনই কালোজিরা খাবেন। গরম খাদ্য বা ভাত খাওয়ার সময় কালোজিরার ভর্তা খান রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকবে। এ ছাড়া কালোজিরা, নিম ও রসুনের তেল একসঙ্গে মিশিয়ে মাথায় ব্যবহার করুণ। এটি ২-৩ দিন পরপর করা যায়।

👉 ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণঃ কালোজিরার তেল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখতে সহায়তা করে। প্রতিদিন সকালে এক কাপ চায়ের সঙ্গে আধা চা চামচ তেল মিশিয়ে পান করুন।

এছাড়া এক কাপ চা-চামচকালোজিরার তেল, এক কাপ রং চা বা গরম ভাতের সাথে মিশিয়ে দৈনিক ২বার করে নিয়মিত সেব্ন করুন। যা ডায়বেটিকস নিয়ন্ত্রণে একশত ভাগ ফলপ্রসূ।

অথবা কালোজিরার চূর্ণ ও ডালিমের খোসা চূর্ণ মিশ্রণ এবং কালোজিরার তেল ডায়াবেটিসে উপকারী। 

👉 ওজন নিয়ন্ত্রণঃ মেদ ঝরাতে গ্রিন টি-র সঙ্গে মিশিয়ে নিন কালোজিরার গুঁড়া। হজমশক্তি বাড়িয়ে শরীরের মেদ ঝরাতে বিশেষ কাজে আসে এই ঘরোয়া কৌশল।

অথবা উষ্ণ পানি, মধু ও লেবুর রসের মিশ্রণের সাথে কিছু কালোজিরা বা তার পাউডার ছিটিয়ে দিন। এভাবে নিয়মিত পান করলে দারুণ উপকার পাওয়া যায়।

আবার কালোজিরা ওটমিল ও টক দইয়ের সঙ্গে যুক্ত করে খেলে বেশ উপকার পাবেন।

👉 কোষ্ঠকাঠিন্যঃ হজমের সমস্যায় কালোজিরা শুকনো খোলায় ভেজে বেটে গুঁড়া করে নিন। এরপর এক-দুই চা-চামচ কালিজিরা পানির সঙ্গে খেতে থাকুন। অথবা আধ কাপ ঠান্ডা করা দুধে এই কালোজিরা এক চিমটি মিশিয়ে খালিপেটে খান প্রতিদিন। এভাবে প্রতিদিন দু-তিনবার খেলে এক মাসের মধ্যে হজমশক্তি বেড়ে যাবে। পাশাপাশি পেট ফাঁপাভাবও দূর হবে।

👉 দাঁতের ব্যথা নিরাময়ঃ দাঁতে ব্যথা হলে কুসুম গরম পানিতে কালিজিরা দিয়ে কুলকুচ করলে ব্যথা কমে। এছাড়া জিহ্বা, তালু, দাঁতের মাড়ির জীবাণু মরে গিয়ে স্বস্তি এনে দেবে। আবার জিহ্বা, টাকরা বা মাড়িতে থাকা খাদ্যের জীবাণু সহজেই মরে যায়। ফলে মুখে আর দুর্গন্ধ হয় না।

👉 চুলপড়া রোধঃ এক চামচ নারিকেল তেলের সঙ্গে সম পরিমাণ কালোজিরার তেল মিশিয়ে গরম করে নিন। মাথায় ত্বকে এই তেল হালকা অবস্থায় মালিশ করুন। এক সপ্তাহ টানা এমন করলে চুল পড়ার সমস্যা মিটবে অনেকটাই। এক্ষেত্রে সপ্তাহে কয়েকবার কালোজিরার তেলের ব্যবহার চুলের সমস্যাকে দূর করতে পারে।

👉 রূপচর্চা ও ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধিঃ শীতের দিনে শুষ্ক ত্বকের জন্য ব্যবহার করতে পারেন কালোজিরার তেল। দুই চা-চামচ কালোজিরার তেল, ১ চা-চামচ নারকেল তেল, ১ চা-চামচ গ্লিসারিনের সঙ্গে মধু আর লেবুর রস মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহার করলে তা দীর্ঘক্ষণ ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি দূর হবে ত্বকের কালো দাগও।

অলিভ অয়েল ও কালোজিরা তেল মিশিয়ে মুখে মেখে এক ঘণ্টা পর সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলন। অথবা লেবুর রস ও কালোজিরার তেল মিশিয়ে দিনে দু’বার মুখে লাগান। ত্বকে ব্রণ ও দাগ কমে যাবে।

চর্মরোগ সারাতে আক্রান্ত স্থানে ধুয়ে পরিষ্কার করে তাতে মালিশকরে; এক চা-চামচ কাঁচা হলুদের রসের সাথে সমপরিমাণ কালোজিরার তেল সমপরিমান মধু বা এককাপ রং চায়ের সাথে দৈনিক ৩বার করে ২/৩ সপ্তাহ পান করুন।

👉 কালিজিরা সেবনে সর্তকতাঃ কালিজিরা নিয়মিত ও পরিমিত খেতে হয়। অতিরিক্ত খুব বেশি খেলে বা ব্যবহার করলে হিতের বিপরীত হয়। তাই জেনে শুনে বুঝে নিশ্চিত হয়ে কালিজিরা বা কালিজিরার তেল সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাত করে খেতে হবে।

কালোজিরার তেল গর্ভাবস্থায় গ্রহণ করা যাবে না। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কালিজিরা খেলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে। গর্ভাবস্থায় ও দুই বছরের কম বয়সের বাচ্চাদের কালিজিরার তেল সেবন করানো উচিত নয়।

অনেকেই কালিজিরা হজম করতে পারেন না। তবে আস্তে আস্তে অভ্যাস করলে ভালো। যারা সহজে কালিজিরা হজম করতে পারেন না তারা খাবেন না, যারা পারেন তারাই নিয়মিত পরিমিত খাবেন।

ভেজাল বা নকল বা কৃত্রিম কালিজিরার তেল কখনও খাওয়া ঠিক না। অধিক পুরনো কালিজিরা তেল স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক।

তথ্যসূত্রঃ

১। তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, গাজীপুর।

২। বাংলাপিডিয়া।

৩। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা- প্রথম আলো, কালেরকন্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, জনকণ্ঠ ইত্যাদি।

৪। ইন্টারনেট ওয়েবসাইট।

 


খাঁটি কালোজিরা তেল পেতে ইনবক্স করুন


Messenger

Comments (0)


There are no comments yet.
Your message is required.
Markdown cheatsheet.

Or Login / Register to add a comment
-